Anwar Hussain

Anwar Hussain

Front-End Web Developer - HTML5, CSS3, JavaScript, React, VueJS, Git

শিলং ভ্রমণ ইতিবৃত্ত – ২

খুব সকালে সবার ঘুম ভাঙ্গানোর দায়িত্ব নিয়ে আগের দিন রাতে ১১/১২ টার দিকে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। সারাদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণে বিছানায় গা লাগাতেই ঘুম আসতে দেরি হলো না।

সকাল ৬ টায় সবাইকে ডেকে ডুকে টেনে হিঁচড়ে তুললাম আমি। ফ্রেস হয়ে সকাল ৮ টার মধ্যে রুম থেকে বের হয়ে গেলাম বাইরে নাস্তা করবো বলে। কিন্তু বিধিবাম! সকাল ৮ টা বাজে অথচ কোন রেস্টুরেন্ট এখনো খোলা হয়নি। কি খাবো এই ডিসিশনও ঠিক মতো নিতে পারছিলাম না, এতো সকালে আমাদের কারোরই খাবার অভ্যাস নেই। অতঃপর খালি পেটেই রউনা দিলাম পুলিশ বাজার ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের দিকে। যেহেতু এইদিনের ট্যুর প্লান অনুযায়ী সবকটা ডেসটিনেশন শহরের আশেপাশেই তাই প্রথমে আমার ইচ্ছা ছিল লোকাল বাস কোথায় আছে খুঁজে দেখবো এবং সম্ভব হলে সেটা দিয়ে আজকের দিন ঘুরবো। কিন্তু সাইফুল বাধা দিল, সে বলল যে ট্যাক্সি দিয়ে ঘুরলে সময় বাচবে এবং আমাদের বারবার বাসের জন্য আলাদা ভাবে অপেক্ষা করা লাগবে না, আমিও ভেবে দেখলাম তাই ঠিক। এখানের ট্যাক্সি ড্রাইভার গুলো চূড়ান্ত রকমের বজ্জাত। একজন কথা বলার সময় আরেকজন এসে কথা বলা শুরু করে দেয়, আলাদা গিয়ে নিজেরা আলাপ করতে চাইলাম, সেখানে পিছুপিছু চলে আসে। অবশেষে একজনের সাথে কথা বলে ফাইনাল করলাম।

fullsizeoutput_4

ড্রাইভারকে বলে নিলাম কোথায় কোথায় আজকের দিন ঘুরবো, সেই অনুযায়ী সর্বপ্রথম গিয়েছি ইলিফ্যান্ট ফলস। ঝরনার রাজ্য মেঘালয়ে এসে এটাই আমাদের প্রথম ঝরনা দেখা। আমার কেন জানি মন ভরলো না এই ঝরনায়। ১ম, ২য়, ৩য় তিনটি ধাপই শেষ করে বেরিয়ে এলাম খুব দ্রুত। পরবর্তী ডেসটিনেশন লাইতলাম গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন, পাহাড়ি আঁকাবাঁকা এবং ভাঙাচুরা রাস্তা পেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় লেগেছিল সম্ভবত ১ ঘণ্টার কিছু বেশি। তখন সূর্য মাথার একদম উপরে। কিন্তু পাহারের এই মিলনমেলা সূর্যের তাপকে হার মানিয়ে দিলো। আমরা ট্রেইল ধরে ধরে নিচে নেমে গেলাম। প্রথম ধাপ নেমেই প্রথমে একটি নীল দরজার সাদা রঙের ঘর দেখতে পেলাম। খুব সম্ভবত এটি ট্যুরিস্টদের জন্য নির্মান করা টইলেট। শিলং এ প্রায় সব জায়গাতেই টয়লেট এবং চেঞ্জিং রুম থাকে। সারি সারি পাহাড় আর মেঘ আমাদের সামনে খেলা করছিল। বুক ভরে নির্মল বাতাস নেবার জন্য পৃথিবীতে এর চাইতে ভাল জায়গা খুব কমই পাওয়া যাবে। পাহাড়ের উচ্চতা ২-৩ হাজার ফুট তো হবেই। উপর থেকে থেকে পাহাড় গুলো একদম বার্ডস আই ভিউ তে দেখা যায়।

IMG_1430

আমরা পাথর বসানো সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে ৫০০ ফুটের মতো নিচে নেমে গেলাম। নামার পথে ক্ষণে ক্ষণে বিশ্রামাগার বানানো রয়েছে। কোথাও কোথাও অনেক ঝুকিপুর্ণ জায়গায় সিমেন্টের তিরী সিঁড়ি এবং লোহার বেষ্টনী দেয়া আছে। পাহাড়ের একদম নিচে খাসিয়াদের বসতি, প্রতিনিয়ত এই পাহাড় বেয়ে উঠা নামা করা তাদের নিত্যদিনের কাজ। কিন্তু আমরা এই ৫০০ ফুট বা তারও কম নেমেই ক্লান্ত হয়ে এক বিশ্রামাগারে আশ্রয় নিয়েছি। মেঘ আর পাহাড়ের যেই চোখ জুড়ানো সৌন্দর্য উপভোগ করেছি তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। চোখের সামনে ৩০০ ডিগ্রী এঙ্গেলে যেদিকে তাকাবে সেদিকেই সারি সারি পাহাড় শিলং এর আর কোথাও দেখা যাবে না। গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে টুরিস্ট একেবারে যায় না বললেই চলে। তবে শিলং এর অন্যান্য প্লেস গুলো সব সময় টুরিস্টের পদচারনায় পরিপুর্ন থাকে। হয়তো এটি একটু অফসাইড হওয়ায় কেও এখানে আসতে চায় না। মনে করে এই সৌন্দর্য হয়তো চেরাপুঞ্জি বা অন্য কোথাও দেখে পুষিয়ে নিবে। কিন্তু এই অতুলনীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর কোথাও পাওয়া সম্ভব নয়।
যাইহোক ঘণ্টা দেরেক বসে থেকে ছবি ভিডিও করা শেষ হলে উপরে উঠতে থাকলাম। এদিকে সকাল থেকে কিছুই না খাওয়ায় পেটের ভিতর মোচড় দিয়ে উঠছিল। উপরে উঠে এক খাসিয়া দোকানে চা এবং পেট ভরে কেক আর কলা খেয়ে নিলাম। সেখানে একমাত্র এই একটি দোকানই রয়েছে, তাই যদি কেও ভারি খাবার প্রত্যাশা করেন তাহলে হয়তো নুডলস পাওয়া যেতে পারে। তবে নিজের সাথে লাঞ্চবক্স ভরে খাবার নিয়ে আসলে মন্দ হয় না।

IMG_1491

দিনের আমাদের পরবর্তী আরও দুইটি আকর্ষণ বাকি থাকায় আর বেশি সময় সেখানে থাকা সম্ভব হলো না। গাড়িতে উঠে চলে এলাম শিলং ভিউ পয়েন্ট দেখার জন্য। এখান থেকে পুরো শিলং শহর এ ঝলকে দেখা যায়। শিলং ভিউ পয়েন্ট মেঘালয়ের বিমান বাহিনীর কোন এক কোয়ার্টারের ভিতরে অবস্থিত তাই সেখানে ঢুকতে হলে স্পেশাল সিকিউরিটি প্রোটোকলের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। প্রথমত যেই ড্রাইভারকে সাথে নিয়ে যাচ্ছেন তার ভ্যালিড ড্রাইভিং লাইসেন্স সাথে থাকতে হবে। এন্ট্রি খাতায় সাইন নিয়ে আপনাদের পাসপোর্ট জমা রেখে দিবে সিকিউরিটি অফিসার। আমাদের ড্রাইভারের সাথে তার ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না, তাই আমরা সেখানে থাকা অন্য এক ড্রাইভারের আরেকটি হাফ ভাঙ্গা গাড়িতে করে ভিউ পয়েন্টে যাই। ২টা ওয়াচ টাওয়ার রয়েছে যার একটিতে বাইনোকুলার দিয়ে শিলং শহর কাছ থেকে দেখার সুযোগ আছে। প্রতিবার আপনি ১ মিনিটের জন্য দেখতে পারবেন যার জন্য ১০ রুপি দিতে হবে। এটা আমি বুঝি না যে, দূর থেকে এক ঝলকে পুরো শহর দেখতে গিয়ে মানুষ কেন আবার বাইনোকুলারে জুম করে দেখতে চাইবে? যাইহোক কারো জানালায় উকি মারার আগ্রহ আটকে রাখতে না পেরে আমিও দেখেছিলাম। কিন্তু কোন জানালায় তাক করতে পারার আগেই ১ মিনিট শেষ! আরও এক মিনিটে ১০ রুপি খরচ করে দেখতে ইচ্ছা হলো না। কিছুক্ষণ এদিক সেদিক ঘুরাফেরা করে এটা ওটা দেখে গাড়িতে ফিরে গেলাম। তখন সম্ভবত দুপুর ৩ টা বাজে। এখানে অল্প কিছু ঝালমুড়ি খেয়ে নিলাম। সবাই ক্ষুদার্ত হয়ে আছে কিন্তু সময়ের অভাবে কেও কিছু খাচ্ছি না। সেদিনের ট্যুর প্লানটি অনেক টাইট হয়ে গিয়েছিল। আগে থেকে আমি বুঝতে পারি নি এই ৪ টি প্লেস দেখতে এতো সময় লেগে যাবে। তাছাড়া এটা আমার প্রথম ট্যুর প্লান ছিল বলে তেমন একটা ভাল মতো টাইম বাজেট করতে পারি নি। আপনারা যারা ট্যুর প্লান করছেন তাঁরা সময়ের দিকে নজর দিয়ে প্লান করবেন, লক্ষ রাখবেন যাতে বেশি টাইট শিডিউল হয়ে না যায়। দিনে ২ একটির বেশি প্লেস দেখার প্লান না করাই ভাল। তবে কোন প্লেস পছন্দসই না হলে সেখানে অযথা সময় অপচয় করারও কোন মানে নেই। পরবর্তী ডেসটিনেশনে বেশি করে সময় দিতে পারেন।

আমাদের পরবর্তী ডেসটিনেশন উমিয়াম লেইক। এটি শহরের অপর প্রান্তে অবস্থিত। গাড়ির ড্রাইভারকে ইংরেজিতে বললাম যে আমরা উমিয়াম লেইকে যাবো পথের মধ্যে কোথাও খাবারের জন্য ডাবা কিংবা রেস্টুরেন্ট পাবো কি না। সে বলল যে পাবো, তার কথায় ভরসা করে চলা শুরু করলাম। আবারো কথাচ্ছলে তাকে জিজ্ঞেস করলাম উমিয়াম লেইকে যেতে কত সময় লাগবে? সে বলল এই তো এসে পরেছি আর ৫/১০ মিনিট লাগবে। এদিকে গুগল ম্যাপ বলছে আমরা মাত্র শহরের কাছাকাছি এসেছি। লাগলো গণ্ডগোল, ড্রাইভার মনে করেছে আমি ওয়ার্ডস লেইকে যাবার কথা বলেছি তাই সে এই রাস্তায় নিয়ে এসেছে। শহরে যেহেতু এসেই পরেছি এখন কোন এক রেস্টুরেন্টে বসে কিছু খেয়ে দেয়ে তারপর সেদিকে যেতে বলছে সবাই। তখন সময় প্রায় ৪টা বাজে বাজে। এদিকে উমিয়াম লেইকে গিয়ে সূর্যাস্ত দেখার প্লান। আমার যে খুদা লাগেনি তা কিন্তু নয়, আমিও প্রচুর খুদার্ত তবে উমিয়াম লেইকে সূর্যাস্ত দেখাটা যেন আরও বেশি ইম্পোর্টেন্ট! তো সাইফুলের সাথে বাক বিতণ্ডা করে অবশেষে রাজি করালাম যে আমরা পথে কিছু পেলে কিনে নিবো অথবা একেবারে উমিয়ামে গিয়েই লাঞ্চ করবো। বাকি দুজন চুপ করে ঝগড়া উপভোগ করছে।

IMG_1708

উমিয়ামে পৌঁছে সর্বপ্রথম নাজমুল ভাইয়ের কথা সে পরের দিন বাংলাদেশে চলে আসবে। তার জন্য এই ট্যুর কন্টিনিউ করা সম্ভব না। আমি তাকে বুঝানোর চেষ্টা করলাম যে হোটেলে গিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করার জন্য। ক্ষুদার জ্বালায় কাতর একেকজনের চেহারার দিকে তাকানো যাচ্ছিলো না। ওখানে এক রিসোর্টের ক্যান্টিনে বসে খাবার দাবার খাওয়ার পরে লেকের পারে বসে নাজমুল ভাইকে আবারো জিজ্ঞেস করলাম বাড়িতে চলে আসবেন কিনা। উনার মাথা ততক্ষণে ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছে। উনি এখন সবার ফটো তুলায় ব্যাস্ত হয়ে পরেছেন। বুঝা গেল আপাতত দেশে ফেরত আসার চিন্তা ভাবনা বাদ দিয়েছেন। সবুজ ঘাসে বসে অনেকক্ষণ আড্ডা দিলাম, সূর্যাস্ত দেখলাম। জিন্স টিশার্ট পড়া সুন্দরী তরুণীদের আনাগোনায় লেইকের সৌন্দর্য আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে আমরা উমিয়াম লেইক থেকে বিদায় নিয়ে হোটেলে ফেরত গেলাম।

সারাদিন তেমন ভাল কিছু খাইনি তাই আজকে ভেবে রেখেছি যে করেই হোক একটা ভাল রেস্টুরেন্ট খুঁজে বের করতেই হবে। পুলিশ বাজারের মূল গলিতে ২/১ টা রেস্টুরেন্টে গিয়ে মেন্যু চেক করে দেখলাম কি কি আছে পেট পুরে খাবার মতো। অবশেষে বিরিয়ানি/সাদা ভাত সাথে বিফ/মাছ পাওয়া যায় এমন একটি রেস্টুরেন্ট খুঁজে পেলাম। এই রেস্টুরেন্টের খাবারের দাম একটু বেশিই তবে ভাল খাবারের লোভ সামলাতে পারলাম না। গিয়েই অর্ডার করে ফেললাম ২ টা মাটন বিরিয়ানি এবং ভাত মাছ। সব কিছুরই পরিমাণ এতো বেশি ছিল যে আমরা খেয়ে শেষ করতে পারি নি। রেস্টুরেন্টের ম্যানেজারের সাথে কথা হল কিছুক্ষণ, সে কলকাতার বাঙ্গালি, তাই তার সাথে বাংলায়ই কথা বলা গেল।

রাতে খেয়েদেয়ে রুমে ফিরার পথে সাইফুল গেল পান খাওয়ার জন্য। পুলিশ বাজার পয়েন্টে অনেক গুলো পানের দোকান রয়েছে। এক খাসিয়া মেয়ের কাছ থেকে পান কিনে মুখে পুরে দিয়ে তার মনে পড়লো আরেকটু সুপারি পেলে মন্দ হয় না। তাই সে হাত বাড়িয়ে দিলো পানয়ালির দিকে, কিন্তু মুখ দিয়ে তার কোন কথা বের হচ্ছে না। আমরা সবাই পাশে দাঁড়িয়ে আছি সে কি চায় জানার জন্য। অনেকক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থেকে আমার কাছে জানতে চাইলো সুপারির হিন্দি যেন কি? আমিও কোন জবাব দিতে পারলাম না! সে এক হাতে মাথা চুলকাচ্ছে আরেক হাত পেতে আছে খাসিয়া মেয়ের দিকে। অবশেষে কোন ভাবে মেয়েকে বুঝাতে পেরেছিল যে সে সুপারি চেয়েছে। এরকম পরিস্থিতিতে মেয়েটিও তার হাসি আটকে রাখতে পারলো না, আমরা তো হোহো করে হাসছিলাম সাইফুলের এমন কাণ্ড দেখে। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে একটু হাসি ফিরে এলো আমাদের মুখে। হোটেলে ফিরে গিয়ে সারাদিন ঘুরাফেরার হিসাব শেষ করে পরের দিনের ট্যুর প্লান ফাইনাল করে ঘুমিয়ে গেলাম।

If you have enjoyed this post and have some feelings to share, please comment below or drop few lines!

Leave a Reply