Anwar Hussain

Anwar Hussain

Front-End Web Developer - HTML5, CSS3, JavaScript, React, VueJS, Git

শিলং ভ্রমণ ইতিবৃত্ত – ১

আমার জন্ম বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকা সুনামগঞ্জে। মাঠে ঘাটে খেলতে গেলে বা আনমনা হয়ে নদীর পাড়ে ঘুরার সময় উত্তর দিকে তাকালেই বিশাল পাহাড়ের বেষ্টনী দেখতে পেতাম। এবং মনে মনে ভাবতাম কি আছে ওই পাহাড়ের শেষ প্রান্তে! ছোটবেলায় অনেক রকমের গল্প শুনতাম যেমন এই পাহাড়ের কোন শেষ নাই, যতদূর যাওয়া যায় ততদুর শুধু পাহাড় আর পাহাড়, এর শেষ প্রান্তে রয়েছে জাদুর রাজ্য, কামরুকামাক্কা, যেখানে একবার মানুষ গেলে আর ফেরত আসতে পারে না! পরীরা তাদের বিয়ে করে রেখে দেয়। :p জাদুর রাজ্যের কারণে নয় তবে প্রকৃতির টানে আমার ছোটবেলা থেকেই সেই পাহাড়ের উপড়ে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। ইচ্ছা ছিল সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ে উঠে নিচের দিকে তাকিয়ে আমার জন্মভূমি দেখবো। তাই যখনই সুযোগ হলো দেশের বাইরে ঘুরতে যাওয়ার প্রথমেই বেছে নিলাম মেঘালয়। গতবছর সেপ্টেম্বরের ১৫ তারিখে মেঘালয়ের রাজধানী শিলং এবং বৃষ্টির রাজধানী চেরাপুঞ্জি ভ্রমণে গিয়েছিলাম। অনেক দিন থেকেই লিখবো লিখবো করেও লিখা হচ্ছিল না। আগেও এক দুই বার লিখা শুরু করে শেষ করতে পারি নি। তাই এবার খুবই সংক্ষিপ্ত আকারে লিখা শেষ করবো ভেবে লিখতে বসেছি। আমার এ লিখাকে কেও ট্রাভেল গাইড হিসাবে না পড়লেই খুশি হবো। কারণ সচরাচর ট্র্যাভেল গাইডে যে ধরণের তথ্য দেয়া থাকে সেরকম তথ্য নির্ভর পোস্ট লিখতে পারবো না বলে মনে হচ্ছে।

IMG_1387

সিলেট থেকে তামাবিল বা ডাউকি বর্ডারের দিকে খুব সকাল সকাল আমরা ৪ জন রউনা দিলামঃ নাজমুল ভাই, সাইফুল, জহুরুল ভাই এবং আমি। উদ্দেশ্য ছিল বর্ডার খোলার সাথে সাথেই যেন আমরা ইমিগ্রশনের সকল কাজ শেষ করে ফেলতে পারি। আগে থেকেই চেকলিস্ট করে দরকারি সকল জিনিস পত্র গুছিয়ে নিয়েছিলাম। তবুও বারবার ব্যাকপ্যাকের পকেটে হাত দিয়ে দেখে নিচ্ছি পাসপোর্ট, রোড ট্যাক্স এবং দরকারি অন্যান্য কাগজ পত্র আছে কিনা। এটিই প্রথম বিদেশ ভ্রমণ, তাই অনেক নার্ভাস লাগছিল। সিলেট থেকে সিএনজি করে তামাবিল ইমিগ্রেশন অফিসে পৌঁছে প্রথমেই বাংলাদেশ অংশের ইমিগ্রেশন করে ফেললাম। সাথে ক্যামেরা, ল্যাপটপ বা অন্য যে কোন মূল্যবান জিনিস থাকলে সেটি এন্ট্রি করিয়ে যেতে হয় যাতে ফেরত আসার সময় তাঁরা বুঝতে পারে কোন গুলো সাথে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আর কোনটি সে দেশ থেকে কিনে আনা হয়েছে, ট্যাক্স আরোপ হয় নতুন কিনে নিয়ে আসা জিনিসের উপর। তাই যারাই বিদেশ থেকে যে কোন জিনিস কিনে আনতে চান, সাথে তার মানি রিসিপ্ট রাখবেন যাতে ট্যাক্সের পরিমাণ নির্ধারনে কোন সমস্যা না হয়। যাইহোক, আমরাও আমাদের ক্যামেরা খাতায় এন্ট্রি করিয়ে নিলাম। এর পর বিজিবি চেক পয়েন্টে নাম – পাসপোর্ট নং লিখে রেখে আমাদের বর্ডার অতিক্রম করার অনুমুতি দিয়ে দিলো। এক দেশ থেকে আরেক দেশে পায়ে হেটে চলে যাচ্ছি একথা ভাবতেই মনের মধ্যে অন্যরকম এক অনুভূতি খেলা করে গেল। নো ম্যানস ল্যান্ডে দাঁড়িয়ে কিছু ছবি তুলে চলে গেলাম বিএসএফ চেক পয়েন্টে, সেখানে আবারও নাম-পাসপোর্ট নং এন্ট্রি করে অল্প একটু হেটে চলে গেলাম ইমিগ্রেশন অফিসে। আমাদের ঠিক আগেই একটি শ্যামলী পরিবহণ বর্ডার ক্রস করেছিল, তাই ইমিগ্রেশন অফিসে একটু ভিড় দেখতে পেলাম। মোটামুটি ৩০ থেকে ৪০ মিনিট অপেক্ষা করে আমাদের ইমিগ্রেশন শেষ করতে হলো।

অফিস থেকে বের হয়েই সরাসরি শিলং যাওয়ার জন্য ট্যাক্সি পাওয়া যায় কিন্তু দাম কিছুটা বেশি হবে চিন্তা করে এখান থেকে নিলাম না। আরেকটু সামনেই ডাউকি বাজার, সেখান থেকে টাকা থেকে রূপি কনভার্ট করে তারপর ট্যাক্সি নেওয়ার প্লান। তাই ইমিগ্রেশন অফিসের সামনে থেকে জনপ্রতি ১০ রুপি করে লোকাল ট্যাক্সি ভাড়া করে চলে গেলাম ডাউকি বাজারে। এখানে এসে দিদির দোকান থেকে ৩/৪ হাজার টাকার সমপরিমাণ রুপি নিয়ে নিলাম। এই বাজার থেকে শিলং যাওয়ার ২টি উপায় রয়েছেঃ ১। ট্যাক্সি রিজার্ভ করে ২। টাটা সোমো গাড়িতে। টাটা সোমো হচ্ছে আমাদের দেশের লেগুনা ধরণের গাড়ি, এক সাথে গাদাগাদি করে অনেক মানুষ বসতে হয়। একই তো এভাবে বসতে হবে তারউপর আকা বাঁকা রাস্তা, কোমরের হাড্ডি ঠিক থাকবে কিনা সেই চিন্তা করে ভয় পেয়ে ট্যাক্সি ভাড়া করলাম ১৫০০ রূপি দিয়ে। ডাউকি বাজার থেকে সরাসরি শিলং পুলিশ বাজার। অনেকে প্রথম দিন মাউলিনং ভিলেজ ঘুরে শিলং যেতে চান, তাদের জন্য ভাড়াটা বেশি পড়ে, সেটা ডাউকি বাজারে ড্রাইভারদের সাথে আলাপ আলোচনা করে নেয়া যায়, প্রায় সবাই বাংলা বুঝে এখানে।

যাওয়ার পথে সারাটি রাস্তা আমাদের গাড়ি শুধু উপর দিকেই উঠছিল, কোথাও কোথাও আমরা ঠিক মেঘের ভিতর দিয়ে যাচ্ছিলাম। এমনই একটি যায়গা দেখে কিছু সময় মেঘের ভিতর হাটাহাটি করলাম এবং ছবি তুললাম। মেঘগুলো যেনো ঠিক মানুষের মতোই হেটে হেটে রাস্তার এপাশ থেকে ওপাশে যাচ্ছিলো, আর আমরা সেটি মন ভরে দেখছিলাম। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা পেরিয়ে সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৫০০০ ফুট উপরে শিলং শহরে পৌছাতে আমাদের সময় লেগেছিল ৩ ঘন্টা।

যেহেতু আমরা আগে থেকে কোন হোটেল বুকিং দিয়ে যাই নি, শিলং শহরে পৌছে আমাদের সর্বপ্রথম কাজ ছিল হোটেল খুজে বের করা। ট্যাক্সি ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করাতেই সে বলল যেখানে নামবো তার আশেপাশে অনেক হোটেল রয়েছে। কিছু হোটেল দেখে আমাদের বাজেটের মধ্যেই “হিল স্টার” নামের এক হোটেলে চেক ইন করি। আমাদের চার জনের থাকার উপযোগী একটি রুমের ভাড়া পরেছিল প্রতিরাত ১৩৪৪ টাকা। হোটেল রুমে ২ টি আলাদা পার্টিশন করা রুমে ২ টি ডাবল খাট, টিভি, ফ্যান এবং গোসল করার জন্য গরম পানির ব্যবস্থা ছিল। এছাড়া আমাদের আর বেশি কিছুর প্রয়োজনও ছিল না, শুধুমাত্র রাত কাটাতে পারলেই হলো আর কি। ব্যাচেলরদের থাকার জন্য এরকম বাজেটে এটাই বেস্ট হোটেল। ফ্যামিলি নিয়ে থাকার জন্য শিলং শহরে অনেক ভাল এবং মধ্যম মানের হোটেল রয়েছে। একটু খুজা খুজি করলে হাতের কাছেই পাওয়া যাবে। শিলং পুলিশ বাজার পয়েন্ট থেকে যত গুলো গলি বের হয়েছে সব গুলোতেই ভাল ভাল হোটেল আছে। আমরা এ কয়দিন ছিলাম এই হোটেল হিল স্টারের থেকেছি। হোটেলে চেক ইন করার সময় পাসপোর্ট ইনফোরমেশন এবং ভিসা স্ক্যান করে নিবে, সাথে দিতে হবে এক কপি ছবি। সুতরাং দরকারি কাগজপত্রের সাথে কিছু পাসপোর্ট সাইজের ছবি রাখতে হবে।

দুপুরে হোটেলে ফ্রেশ হয়ে প্রচন্ড খুদার্থ অবস্থ্যায় মুসলিম হোটেলের সন্ধানে বের হই। হোটেল থেকে একটু দুরেই মসজিদ এবং তার পাশে মুসলিম হোটেল রয়েছে। পুলিশ বাজারে মুসলিম মালিকানাধিন খুব বেশি খাবার হোটেল নাই এবং যেগুলো রয়েছে তার পরিবেশও ততটা ভাল না। ক্ষুদার তারনায় এমনই একটি অপরিচ্ছন্ন মুসলিম হোটেলে আমরা দুপুরের খাবার খাই, নাম পুলিশ বাজার হোটেল। ভাত, মাছ, গরুর মাংস, ডাল কোনটাই স্বাদের খাবার নয়। খাবারের দামও আবার বেশি মনে হয় নি।

Words Lake, Shillong

সো, পেট পুজা খতম করে বের হলাম শিলং শহরটা ঘুরে দেখবো বলে। ফুটপাথ ধরে হাটতে হাটতে চলে গেলাম ওয়ার্ডস লেক-এ, এটি পুলিশ বাজার পয়েন্ট থেকে ৬০০ মিটার দূরে। কিন্তু আমরা ভূল পথে হেটে প্রায় ১.৫ কিমি পাড়ি দিয়েছিলাম। ভূল পথে হাটার জন্য আমরা মোটেও উদ্বিগ্ন ছিলাম না, কেননা, শিলং শহরের প্রতিটি ফুটপাথই অনেক সুন্দর, ফুটপাথ বেয়ে কখনো পাহাড়ের উপরে উঠতে হয়েছে, আবার কখনো নামতে। লেকে প্রতি পার্সন এন্ট্রি ফিস ১০ টাকা এবং সাথে ক্যামেরা থাকলে তার জন্য আলাদা ভাবে ২০ টাকা দেয়া লাগে। ওয়ার্ডস লেইক আকারে ছোট হলেও এর সৌন্দর্য অপরিসিম। লেকের পাড়ে একটু পরপর বসার জন্য টেবিল তো রয়েছেই, চাইলে ঘাসের বিছানাতেও আরাম করে বসে কাটিয়ে দেয়া যাবে সারা বিকাল। প্রচন্ড টায়ার্ড থাকার কারণে সেদিনের তালিকা থেকে বাকি জায়গা গুলো বাদ দিতে হয়েছিল। সন্ধার পর আবার হাটতে হাটতে হোটেলে ফেরত গেলাম। অল্প কিছু সময় বিস্রাম নিয়ে রাতের খাবার খেতে বের হয়ে গেলাম, কিন্তু এইবার অন্য আরেকটি মুসলিম হোটেল খুজে পেলাম মসজিদের ঠিক পাশেই। কিন্তু বিধিবাম, পরিবেশ সুন্দর হলেও এর খাবার মান আগের টার মতোই। এখানেও মন ভরে খেতে না পেরে রাগে দুঃখে KFC তে গিয়ে হালকা ভুড়ি ভোজ করলাম। পুলিশ বাজার পয়েন্টেই Mar Ba Hub বিল্ডিং এ KFC.

হোটেল থেকে বলে দিয়েছিল রাত ৯ তার পড়ে যেন বাইরে না থাকি, পুলিশ বাজারের এই গলিটা তেমন সেইফ না। একটু ভড়কে গিয়েছিলাম এটা শুনে। কিন্তু ৮ তার দিকে যখন হোটেলে ফিরছিলাম তখন দেখলাম শুধুমাত্র গলির ভিটরের না, মেইন রোডের সব দোকান-পাঠ গুছিয়ে নিচ্ছে। বেশি তার পর্যন্ত বাইরে থাকার কোন কারণ রইলো না আর। তবে এডভ্যাঞ্চার প্রেমীরা বেশি রাত পর্যন্ত বাইরে থাকতে পছন্দ করেন যেটা জানি, এজন্য নিজ দায়িত্বে বাইরে ঘুরাফেরা করবেন।

If you have enjoyed this post and have some feelings to share, please comment below or drop few lines!

Leave a Reply